ব্যাপটিস্টরা: গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ
“অতএব কৈসরের যা, তা কৈসরকে দাও; আর ঈশ্বরের যা, তা ঈশ্বরকে দাও।”
মথি ২২:২১
১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনের সিঁড়িতে খোলা আকাশের নিচে ১৫,০০০ মানুষের সামনে বক্তৃতা করতে গিয়ে টেক্সাসের ব্যাপটিস্ট পালক জর্জ ডব্লিউ. ট্রুয়েট ঘোষণা করেছিলেন: “‘কৈসরের যা, তা কৈসরকে দাও, আর ঈশ্বরের যা, তা ঈশ্বরকে দাও,’—ঐশ্বরিক সেই ওষ্ঠ থেকে উচ্চারিত ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী ও ইতিহাস-সৃষ্টিকারী কথাগুলোর একটি। সেই উক্তি একবারেই গির্জা ও রাষ্ট্রের বিচ্ছেদকে চিহ্নিত করেছিল…. এটি ছিল এক নতুন দিনের সূর্যোদয়ের কামানের ধ্বনি, যার প্রতিধ্বনি চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না প্রতিটি দেশে—বড় হোক বা ছোট—স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জার মতবাদ সর্বত্র পূর্ণ প্রাধান্য লাভ করে।”
স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জার ভিত্তিসমূহ
ব্যাপটিস্টদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জার ধারণা রাজনৈতিক তত্ত্ব বা মানবসৃষ্ট নথির ওপর নয়, বরং ঈশ্বরের বাক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে ব্যাপটিস্ট বিশ্বাস এবং তার অনুসিদ্ধান্ত—গির্জা ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃথকীকরণ—বাইবেলের কর্তৃত্বের প্রতি ব্যাপটিস্ট অঙ্গীকার থেকে আসে।
“গির্জা” এবং “রাষ্ট্র” শব্দদুটি দ্বারা কী বোঝানো হয়? “রাষ্ট্র” বলতে সরকারকে বোঝায়। বাইবেল নির্দেশ করে যে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সরকার ঈশ্বর কর্তৃক স্থাপিত (রোমীয় ১৩:১-৫)। সরকারি নেতাদের নাগরিকদের কল্যাণের জন্য কাজ করা উচিত (১ পিতর ২:১৩-১৪)। ব্যাপটিস্ট ও অন্যান্য খ্রিস্টীয় বিশ্বাসীদের সরকারি কর্মকর্তাদের সম্মান করতে ও তাদের জন্য প্রার্থনা করতে হবে (১ তীমথিয় ২:১-৩; ১ পিতর ২:১৭), কর দিতে হবে (মথি ২২:১৭-২২; রোমীয় ১৩:৬-৭), এবং সরকারের আনুগত্য করতে হবে—যদি না সেই আনুগত্য স্পষ্টভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধী হয় (প্রেরিত ৪:১৯-২০; ৫:২৯)। ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপটিস্টরা রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য স্বীকার করেছেন।
“গির্জা” বলতে ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে বোঝায়। ব্যাপটিস্টদের জন্য এর মধ্যে স্থানীয় মণ্ডলী এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সংস্থা—যেমন সমিতি, কনভেনশন, বিদ্যালয় এবং পরিচর্যামূলক প্রতিষ্ঠান—অন্তর্ভুক্ত। ব্যাপটিস্টরা শিক্ষা দেন যে “গির্জা”-র প্রকৃতি হলো যীশু খ্রিস্টের সুসমাচার ছড়িয়ে দেওয়া (প্রেরিত ১:৮), মতবাদ শিক্ষা দেওয়া ও বিশ্বাসীদের বিকশিত করা (মথি ২৮:১৯-২০; ইফিষীয় ৪:১১-১৩), এবং খ্রিস্টের নামে পরিচর্যা করা (মথি ২৫:৩১-৪৬)। গির্জাকে তার মিশন সম্পাদনের জন্য সরকারের তরবারির ওপর নয়, আত্মার তরবারির ওপর নির্ভর করতে হবে।
আদর্শভাবে, গির্জা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে উপকারী। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্র শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রদান করে; এগুলো গির্জার মিশন সম্পাদনে সহায়ক (প্রেরিত ১৩-১৬)। আর গির্জা আইনমান্যকারী, পরিশ্রমী ও সৎ নাগরিক গড়ে তুলতে সাহায্য করে একটি ইতিবাচক সামাজিক ব্যবস্থায় অবদান রাখে (ইফিষীয় ৪:২৪-৩২; ১ পিতর ২:১১-১৭)।
ব্যাপটিস্টরা বলেন যে এই পারস্পরিক উপকারিতা সর্বোত্তমভাবে কার্যকর হয় যখন গির্জা ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথক থাকে এবং কোনোটিই অন্যটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। রাষ্ট্র গির্জার মতবাদ, উপাসনার ধরন, সংগঠন, সদস্যপদ বা নেতৃত্বের ব্যক্তিবর্গ নির্ধারণ করবে না। গির্জাও আত্মিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা আর্থিক সহায়তা লাভের চেষ্টা করবে না। নতুন নিয়মে এমনই একটি মডেল উপস্থাপিত হয়েছে।
সুসমাচার ও গির্জার স্বভাবই এমন সম্পর্কের দাবি করে। বাইবেল প্রকাশ করে যে মানুষ ঈশ্বরের দ্বারা এমন সক্ষমতা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে যাতে তারা তাঁর ইচ্ছা জানতে ও অনুসরণ করতে পারে (আদিপুস্তক ১:২৭)। ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুসরণ করা স্বাধীন পছন্দ হওয়া উচিত, গির্জা বা রাষ্ট্রের জবরদস্তির ফল নয়। খ্রিস্টে পরিত্রাণ যীশু খ্রিস্টকে প্রভু ও ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করার স্বাধীন পছন্দের ফল (যোহন ৩:১৬; ইফিষীয় ২:৮-১০)। তাই গির্জা বা রাষ্ট্র—কোনোটিই সুসমাচারের স্বাধীন ঘোষণা বা তা গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যান করার মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না।
একইভাবে, গির্জাগুলো এমন মানুষদের নিয়ে গঠিত হওয়া উচিত যারা স্বেচ্ছায় বাপ্তিস্ম গ্রহণ ও একত্রিত হওয়া বেছে নিয়েছে (প্রেরিত ২:৪১-৪২)। মানুষ স্বেচ্ছায় দেওয়া দশমাংশ ও দানের মাধ্যমে গির্জাগুলোকে সমর্থন করবে (২ করিন্থীয় ৮:১-১৫)। কেবল যীশুই প্রভু হবেন—কোনো সরকার বা ধর্মীয় সংগঠন নয় (ইফিষীয় ৪:১১-১৬; ফিলিপীয় ২:৮-১১)।
গির্জা-রাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাস
গির্জা-রাষ্ট্র সম্পর্কের বাইবেলীয় আদর্শ খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। খ্রিস্টীয় আন্দোলনের প্রাথমিক বছরগুলোতে রোমান সরকারের হাতে গির্জা নির্যাতিত হয়েছিল। চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সরকার খ্রিস্টীয় আন্দোলনকে শুধু সহনশীলতাই নয়, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থানও প্রদান করে।
এর ফলে গির্জা ও রাষ্ট্রের ঐক্য সৃষ্টি হয়—অর্থাৎ প্রচলিত সরকার এবং খ্রিস্টধর্মের প্রধান রূপের মধ্যে একত্রীকরণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবস্থার ধরন বদলালেও একটি বিষয় স্থির ছিল—“সরকারি” ধর্মীয় রূপ ছাড়া অন্য সব ধর্মীয় প্রকাশ নির্যাতিত হতো। ব্যাপটিস্টদের মতো যারা ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাস করত, তারা সরকারের কাছে বিশ্বাসঘাতক এবং সরকার-সমর্থিত গির্জাগুলোর কাছে ধর্মদ্রোহী বলে বিবেচিত হতো।
ধর্ম বলবৎ করার জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় গির্জাগুলোর আত্মিক প্রাণশক্তি দুর্বল করে এবং অসংখ্য অপরিত্রাণপ্রাপ্ত মানুষকে গির্জায় যুক্ত করে। আরও, কোনো দেশের প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে রক্ষা করার সরকারি প্রচেষ্টা যুদ্ধ ও গৃহবিবাদের সৃষ্টি করে, যা সরকারকেও দুর্বল করে। অতএব, গির্জা ও রাষ্ট্রের ঐক্য তখনও উভয়ের জন্য ক্ষতিকর ছিল এবং আজও ক্ষতিকর।
ব্যাপটিস্টরা এবং গির্জা-রাষ্ট্র সম্পর্ক
গির্জা ও রাষ্ট্রের ঐক্যের অধীনে ব্যাপটিস্টরা কঠোরভাবে নির্যাতিত হয়েছিল। তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, সব মানুষের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, কেবল সহনশীলতা নয়।
ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের জন্য ব্যাপটিস্ট সংগ্রামের ইতিহাস সাহস ও অধ্যবসায়ের কাহিনি। বহু সাহসী মানুষ ধর্মীয় ও সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রবল বিরোধিতার মুখেও নিজেদের বিশ্বাসে অটল থেকেছেন। তারা তা করেছিলেন কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে এতে তারা বাইবেলের শিক্ষার প্রতি বিশ্বস্ত থাকছেন।
উদাহরণস্বরূপ, থমাস হেলউইস (প্রায় ১৫৫৬-১৬১৬), ১৬০০-এর দশকের শুরুতে লন্ডনের একজন ব্যাপটিস্ট পালক, প্রকাশ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। ইংল্যান্ডে রাজা শুধু সরকারের প্রধানই ছিলেন না, চার্চ অব ইংল্যান্ডেরও প্রধান ছিলেন। হেলউইস জোর দিয়ে বলেছিলেন যে জীবনের আত্মিক বিষয়ে রাজার কোনো কর্তৃত্ব নেই। তিনি নিজের লেখা একটি বইয়ের কপি রাজাকে পাঠিয়ে হাতে লিখেছিলেন, “রাজা একজন মরণশীল মানুষ, ঈশ্বর নন।”
রাজা জেমস হেলউইসকে কারাগারে পাঠান, যেখানে তিনি নিজের বিশ্বাস ত্যাগ করতে অস্বীকার করায় মৃত্যুবরণ করেন।
কয়েক বছর পরে আমেরিকায় রজার উইলিয়ামস (১৬০৩-১৬৮৩) গির্জা-রাষ্ট্র পৃথকীকরণের পক্ষে মত দেওয়ার কারণে ম্যাসাচুসেটস বে কলোনি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। উইলিয়ামস আমেরিকার প্রথম ব্যাপটিস্ট গির্জা এবং রোড আইল্যান্ড উপনিবেশ—উভয়ই প্রতিষ্ঠা করেন। সেই উপনিবেশ সবাইকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিল। তিনি “গির্জার বাগান এবং পৃথিবীর প্রান্তরের মধ্যে পৃথকীকরণের একটি বেড়া বা প্রাচীর”-এর পক্ষে লিখেছিলেন।
তবুও “পৃথকীকরণের প্রাচীর” জাতীয় বাস্তবতা হতে বহু বছর লেগেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুমোদনের জন্য জনগণের সামনে উপস্থাপিত হলে তাতে ধর্মীয় স্বাধীনতার কোনো বিধান ছিল না। ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা না থাকলে সংবিধান অনুমোদন ব্যর্থ করার প্রচেষ্টায় ব্যাপটিস্টরা অন্যদের সঙ্গে যোগ দেন। ফলে সংবিধানে প্রথম সংশোধনী যুক্ত হয়, যেখানে বলা হয়, “কংগ্রেস ধর্ম প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত কোনো আইন প্রণয়ন করবে না, অথবা ধর্মের স্বাধীন অনুশীলন নিষিদ্ধ করবে না; কিংবা বাকস্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, অথবা জনগণের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার এবং অভিযোগের প্রতিকারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করার অধিকার সংকুচিত করবে না।”
স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জার চ্যালেঞ্জসমূহ
গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। ক্যাপিটলের সিঁড়িতে ট্রুয়েট যে “স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জার সর্বত্র পূর্ণ প্রাধান্য”-এর আদর্শ প্রকাশ করেছিলেন, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু দেশে ধর্ম ও সরকারের ঐক্য বিদ্যমান এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা খুব সামান্য বা নেই। অন্যত্র পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার বদলে কেবল সহনশীলতাই দেশের আইন। গির্জার পরিচর্যা সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্রের করের অর্থ ও ক্ষমতা ব্যবহার করার প্রলোভন এখনও বিদ্যমান।
ক্রমাগত পরিবর্তিত পৃথিবীতে পৃথকীকরণের ধারণার অর্থ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ। গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ বলতে ব্যাপটিস্টরা ঈশ্বর ও সরকারের পৃথকীকরণ বোঝেন না। সম্পর্কটির ধূসর ক্ষেত্র এবং পৃথকীকরণের অর্থ সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা যে আছে, ব্যাপটিস্টরা সে বিষয়ে অজ্ঞ নন।
তবুও ব্যাপটিস্টরা জোর দিয়ে বলতে থাকেন যে গির্জা বা রাষ্ট্র—কোনোটিই অন্যটির ওপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে না; গির্জা তার মিশন সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্রের অর্থ বা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না; এবং ইতিহাসের সাক্ষ্য হলো, স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জা উভয়ের জন্যই আশীর্বাদস্বরূপ।
উপসংহার
স্বাধীনতার মূল্য হলো চিরস্থায়ী সতর্কতা—বিশেষত ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে। তাই ব্যাপটিস্টদের গির্জা ও রাষ্ট্রকে একীভূত করার প্রচেষ্টা প্রতিরোধ করা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সৃষ্টি করে এমন দুইয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ পৃথকীকরণের জন্য চেষ্টা করা উচিত।
“গির্জা ও রাষ্ট্র পৃথক থাকা উচিত….
স্বাধীন রাষ্ট্রে স্বাধীন গির্জাই খ্রিস্টীয় আদর্শ…।”
ব্যাপটিস্ট ফেইথ অ্যান্ড মেসেজ


