গির্জার দুই কর্মকর্তা: পালক ও ডিকন
“পৌল ও তীমথিয়, যীশু খ্রিস্টের দাস, ফিলিপীতে খ্রিস্ট যীশুতে থাকা সকল পবিত্রজনের প্রতি, অধ্যক্ষ ও ডিকনদের সহিত।”
ফিলিপীয় ১:১
“নতুন নিয়মের একটি স্থানীয় গির্জার কর্মকর্তারা হলেন পালক ও ডিকন (ফিলি. ১:১)। একই পদকে বিভিন্নভাবে অধ্যক্ষ, প্রাচীন বা পালক বলা হয়।”
হার্শেল এইচ. হবস
দ্য ব্যাপটিস্ট ফেইথ অ্যান্ড মেসেজ, পৃ. ৬৯
বছরের পর বছর ব্যাপটিস্ট শাসনব্যবস্থা নতুন নিয়মের গির্জার দুটি শাস্ত্রসম্মত পদ—পালক ও ডিকন—স্বীকার করে এসেছে। ব্যাপটিস্টরা বিশ্বাস করেন যে বাইবেল শিক্ষা দেয়, সব খ্রিস্টীয় বিশ্বাসীকেই খ্রিস্টের নামে অন্যদের সেবা ও পরিচর্যা করতে আহ্বান করা হয়েছে; তবে কিছু ব্যক্তিকে ঈশ্বর বিশেষ পরিচর্যার ভূমিকা পালনের জন্য আহ্বান করেন এবং দান দেন, যেমন পালক ও ডিকন।
ব্যাপটিস্ট পালক
ব্যাপটিস্টরা ঘোষণা করেন যে পালকের পদটি নতুন নিয়মের গির্জার আদলে গঠিত একটি গির্জায় থাকা উচিত এমন দুটি পদের একটি। বাইবেল একই পদের জন্য তিনটি শব্দ ব্যবহার করে: প্রাচীন, পালক এবং অধ্যক্ষ। নতুন নিয়মের গ্রিক ভাষায় এই শব্দগুলো ভিন্ন ভিন্ন কার্যকে নির্দেশ করে, ভিন্ন ব্যক্তিকে নয় (প্রেরিত ২০:১৭-২৮; ১ পিতর ৫:১-৫)।
পালক হিসেবে সেবা করার যোগ্যতা নির্ধারণে ব্যাপটিস্টরা বাইবেলের দিকে তাকান (১ তীমথিয় ৩:১-৭; তীত ১:৫-৯)। এই যোগ্যতাগুলো সাধারণত দুই শ্রেণিতে পড়ে—চরিত্র এবং পরিচর্যার জন্য দান। পালকের পদটি অন্যদের সেবা করার জন্য ব্যবহার করা উচিত, স্বার্থপর বা আত্মপ্রচারমূলক উদ্দেশ্যে নয়।
প্রতিটি ব্যাপটিস্ট গির্জা নিজ পালক হিসেবে যাকে চায় তাকে নির্বাচন (আহ্বান) করে। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় গির্জাভেদে কিছু পার্থক্য থাকে, তবে অধিকাংশ গির্জা সাধারণত নিচের ধারা অনুসরণ করে।
• যখন গির্জায় পালক থাকে না, মণ্ডলী প্রার্থনাপূর্ণভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির যোগ্যতা মূল্যায়ন করার জন্য একটি পালক-অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন করে।
• সতর্ক বিবেচনার পর কমিটি সমগ্র গির্জার কাছে সেই ব্যক্তিকে সুপারিশ করে, যাকে তারা বিশ্বাস করে ঈশ্বর গির্জার পালক হিসেবে চান।
• সম্ভাব্য পালক গির্জায় এসে “আহ্বানের বিবেচনায়” প্রচার করেন। এরপর মণ্ডলী ওই ব্যক্তিকে “আহ্বান” করবে কি না সে বিষয়ে ভোট দেয়। ভোট অনুকূল হলে সম্ভাব্য পালক আহ্বান গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেন।
• পালক ও মণ্ডলী উভয়েই যতদিন মনে করে যে এই সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া উচিত, ততদিন একজন পালক গির্জায় সেবা করেন।
পালক ও গির্জার সম্পর্ক অত্যন্ত বিশেষ। উভয়েরই সুযোগ ও দায়িত্ব রয়েছে, যা যথাযথভাবে পালন করা হলে সম্পর্কটি ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হয়। উদাহরণস্বরূপ, গির্জার উচিত পালকের জন্য প্রার্থনা করা, তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, উৎসাহিত করা এবং গির্জার উদ্দেশ্যসমূহ সম্পাদনে তাকে সহায়তা করা। একইভাবে, একজন পালকের উচিত গির্জার মানুষের জন্য প্রার্থনা করা, তাদের পরিচর্যা করা, শিষ্যত্বে গড়ে তোলা এবং ঈশ্বরভীরু সেবক-নেতৃত্ব প্রদান করা।
ব্যাপটিস্ট ডিকন
একটি ব্যাপটিস্ট গির্জার দ্বিতীয় পদ হলো ডিকনের পদ। পালক সাধারণত মণ্ডলীর সদস্যপদের বাইরে থেকে নির্বাচিত হন, কিন্তু ডিকনরা মণ্ডলীর সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন। ডিকনের বাইবেলীয় যোগ্যতাগুলো (১ তীমথিয় ৩:৮-১৩) প্রধানত চরিত্র এবং গির্জা, পরিবার ও সমাজের মধ্যে সম্পর্কের ওপর জোর দেয়। ডিকনদের এমন ব্যক্তি হতে হবে যাদের চরিত্র নিখুঁত, বিশ্বাস গভীর এবং যারা পবিত্র আত্মার ওপর নির্ভর করেন।
প্রেরিত ৬:১-৬ সম্ভবত ডিকনের ভূমিকার সূচনার বিবরণ দেয়। তাদের মণ্ডলীর শারীরিক প্রয়োজনের যত্ন নেওয়ার কথা, যাতে পালকেরা আত্মিক প্রয়োজনের ওপর মনোযোগ দিতে পারেন। ডিকনদের শাসক সংস্থা হিসেবে নয়, সেবক-নেতা হিসেবে দেখা হয়।
একটি ব্যাপটিস্ট গির্জায় ডিকন নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় পুরো মণ্ডলী অংশগ্রহণ করে। প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিষয়ে গির্জাভেদে পার্থক্য থাকলেও, সাধারণ প্রথা হলো পুরো গির্জা ভোট দিয়ে নির্ধারণ করে কে ডিকন হিসেবে নির্বাচিত হবে।
ডিকনের ভূমিকা গির্জাভেদে ভিন্ন হয়। অনেক গির্জায় ডিকনদের বলা হয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মূল্যায়ন করে সুপারিশ দিতে, যা পরে সমগ্র মণ্ডলীর ভোটের জন্য উপস্থাপন করা হয়। গির্জাগুলো ডিকনদের নানা পরিচর্যায় যুক্ত করে, যেমন অসুস্থদের দেখা করা, দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য করা এবং দরিদ্রদের ত্রাণ প্রদান করা।
ব্যাপটিস্ট অভিষেক
ব্যাপটিস্টরা বিশ্বাস করেন যে অভিষেক কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব প্রদান করে না। এটি গির্জা ও সাধারণভাবে বিশ্বের কাছে এই কথা নির্দেশ করার একটি উপায় যে একজন ব্যক্তিকে পালক বা ডিকন হিসেবে সেবা করার যোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপটিস্টরা চ্যাপলিন, মিশনারি এবং গির্জার কর্মীদের মতো অন্যান্য পরিচর্যাকারীকেও অভিষেকের আওতায় এনেছেন।
সব ব্যাপটিস্ট একমত নন যে অভিষেক প্রয়োজনীয় বা এমনকি উপযুক্ত। তবে অধিকাংশ ব্যাপটিস্ট গির্জায় অভিষেকের চর্চা রয়েছে এবং এটিকে আজীবনের জন্য বৈধ বলে বিবেচনা করা হয়। তাই একজন ব্যক্তি পালক বা ডিকন হিসেবে এক গির্জা থেকে অন্য গির্জায় গেলে তাকে পুনরায় অভিষিক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
ব্যাপটিস্টদের জন্য অভিষেক কোনো সম্প্রদায়ের কাজ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গির্জার কাজ। অন্য গির্জা বা সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্থাকে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা হতে পারে, তবে প্রকৃতপক্ষে অভিষেক করে গির্জাই।
পালকদের ক্ষেত্রে অভিষেকের আগে সাধারণত ব্যক্তিকে সুসমাচার-পরিচর্যার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়। এই লাইসেন্স এমন একটি সময়ের সূচনা করে, যখন গির্জা ও ব্যক্তি উভয়েই মূল্যায়ন করতে পারে তিনি সত্যিই পালকীয় পরিচর্যার জন্য উপযুক্ত কি না। যদি ব্যক্তি সাক্ষ্য দেন যে পবিত্র আত্মার মাধ্যমে ঈশ্বর তাকে অন্তর থেকে সুসমাচার-পরিচর্যার জন্য আহ্বান করেছেন, পদের জন্য বাইবেলীয় যোগ্যতা প্রদর্শন করেন এবং কার্যকর পালকীয় পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় দান দেখান, তবে গির্জা অভিষেকের দিকে অগ্রসর হয়।
পালক ও ডিকনের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাপটিস্ট স্বাতন্ত্র্যসমূহ
পালক ও ডিকন সম্পর্কে ব্যাপটিস্ট শাসনব্যবস্থা অন্যান্য ব্যাপটিস্ট স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাপটিস্ট বিশ্বাস ও অনুশীলনের কর্তৃত্ব হলো বাইবেল। ব্যাপটিস্টরা বাইবেলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে নতুন নিয়মের একটি গির্জায় দুটি পদ রয়েছে—পালক ও ডিকন।
বাইবেল শিক্ষা দেয় যে যারা যীশু খ্রিস্টকে প্রভু ও ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করে, তারা সবাই ঈশ্বরের কাছে সরাসরি প্রবেশাধিকারসম্পন্ন যাজক (১ পিতর ২:৫; প্রকাশিত বাক্য ১:৬; ৫:১০)। আলাদা কোনো বিশেষ যাজকশ্রেণির প্রয়োজন নেই (ইব্রীয় ৮-১০)। তাই ব্যাপটিস্টরা পালকের কথা বলতে “যাজক” শব্দটি ব্যবহার করেন না এবং পালককে এমন যাজকীয় ভূমিকায় কাজ করছেন বলে মনে করেন না যেখানে তিনি তাদের ও ঈশ্বরের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন।
ব্যাপটিস্টরা বিশ্বাস করেন যে সকল বিশ্বাসীর যাজকত্ব এবং আত্মার সক্ষমতার বাইবেলীয় ধারণাগুলো পালকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে দুর্বল করে না। সব বিশ্বাসী-যাজক সমান হলেও, কিছু ব্যক্তিকে ঈশ্বর আহ্বান করেন এবং গির্জার সদস্যরা পালক-নেতা হিসেবে নির্বাচন করেন। বিশ্বাসীরা বাইবেল অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যা করা, খ্রিস্টের ইচ্ছা অনুসন্ধান করা এবং তাঁকে জীবনের প্রভু হিসেবে অনুসরণ করার নিজেদের দায়িত্ব পালকদের হাতে সমর্পণ করবে না।
ব্যাপটিস্টরা মণ্ডলীভিত্তিক গির্জা-শাসন এবং গির্জার স্বায়ত্তশাসনে বিশ্বাস করেন। তাই পালককে স্থানীয় মণ্ডলীর বাইরের কোনো সংস্থা নিয়োগ করে না। প্রতিটি মণ্ডলী নিজ পালক ও ডিকন নির্বাচনের জন্য দায়ী। শাসনের দায়িত্ব পুরো গির্জার হাতে, পালক বা ডিকনদের হাতে নয়। বাইবেল নির্দেশ করে যে পালককে দৃঢ় নেতৃত্ব দিতে হবে, স্বৈরাচারী শাসন নয় (১ পিতর ৫:১-৫)।
স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন ব্যাপটিস্ট জীবনে মতপার্থক্য বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। পালক ও ডিকনের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাপটিস্ট ইতিহাসে গির্জাগুলো পালকের পদে সেবাকারী ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন উপাধি ব্যবহার করেছে। পুরুষ ও নারী উভয়েরই পালক ও ডিকন হিসেবে সেবা করা উচিত কি না, এ বিষয়ে ব্যাপটিস্টদের মধ্যে মতভেদ আছে। ডিকনের সংখ্যা, যোগ্যতা ও কার্যও গির্জাভেদে ভিন্ন হয়।
উপসংহার
পালক ও ডিকনের পদ সম্পর্কে ব্যাপটিস্টদের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও, ব্যাপটিস্টরা একমত যে ঈশ্বর গির্জাগুলোকে সেবক-নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ স্থাপন করেছেন।


